প্রকাশিত:
২৮ অক্টোবার ২০২৬, ২০:১৫
২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবরের ঘটনায় দায়ের করা যেসব মামলা তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার গায়েব করে দিয়েছিল, সেগুলো দ্রুত পুনরুজ্জীবিত করে বিচার ত্বরান্বিত করার দাবি জানিয়েছেন বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সভাপতি নূরুল ইসলাম। আজ বুধবার (২৮ অক্টোবর) বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির, ঢাকা মহানগরীর উদ্যোগে জাতীয় প্রেস ক্লাবের কাজী নজরুল ইসলাম মিলনায়তনে “২৮ অক্টোবর ২০০৬: আওয়ামী নৃশংসতা ও ফ্যাসিবাদের উত্থান” শীর্ষক আলোচনা সভায় সভাপতির বক্তব্যে তিনি এ দাবি জানান।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক সংসদ সদস্য মিয়া গোলাম পরওয়ার।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, “২৮ অক্টোবরের পর আওয়ামী লীগ ফ্যাসিবাদের উত্থান ঘটিয়েছিল। আমরা ২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে সেই ফ্যাসিবাদের কবর রচনা করে আবার নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখতে চাই। বিএনপি হাজারো চেষ্টা করেও আমাদের এই পথ থেকে সরাতে পারবে না। বাংলার ১৮ কোটি মানুষ সংগ্রাম করে ইনসাফপূর্ণ রাষ্ট্রের পথে বাংলাদেশকে আবার এগিয়ে নেবে। এটাই আমরা মনে করি ২৮ অক্টোবরের বিজয়ের তাৎপর্য।”
২৮ অক্টোবরের স্মৃতিচারণ করে তিনি বলেন, “সেদিন আওয়ামী লীগসহ ১৪-দলীয় জোটের সন্ত্রাসীরা বন্দুক, লগি-বৈঠা নিয়ে মুহুর্মুহু হামলা চালাচ্ছিল। ছাত্রশিবিরের জনশক্তিরা পল্টন মোড়ে মানবঢাল হয়ে দাঁড়িয়ে সেই আক্রমণ প্রতিহত করেন এবং নেতৃবৃন্দকে নিরাপদ রাখেন। তাঁরা শহীদ হয়েছেন, তবু দায়িত্বশীলদের গায়ে আঁচড় লাগতে দেননি। পল্টন ট্র্যাজেডির দিনে ইসলামী ছাত্রশিবির প্রমাণ করেছে, যারা আল্লাহর দ্বীনকে বিজয়ী করে তাঁর সন্তুষ্টি অর্জনের লক্ষ্যে জীবন বাজি রাখে, তারা বাতিলের কোনো আঘাতের সামনে মাথা নত করে না।”
আওয়ামী লীগের রাজনীতি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “বাংলাদেশের মাটিতে আওয়ামী লীগের রাজনীতি করার কোনো অধিকার নেই। আওয়ামী লীগ কোনো রাজনৈতিক দল নয়, এটা ফ্যাসিস্ট ও সন্ত্রাসীদের একটি ক্লাব। গণতন্ত্র আর আওয়ামী লীগ একসঙ্গে যায় না। তারা ক্ষমতার বাইরে থাকলে গণতন্ত্রের জন্য মায়াকান্না করে, আবার ক্ষমতায় গেলে গণতন্ত্রের টুঁটি চেপে ধরে।”
তিনি আরও বলেন, “শেখ হাসিনাও পল্টন ট্র্যাজেডি ঘটিয়ে সেনাশাসন আনেন। মঈনুদ্দিন-ফখরুদ্দিনের সঙ্গে আঁতাত করে সাজানো-পাতানো নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় এসে পিলখানা হত্যাকাণ্ড, তথাকথিত মানবতাবিরোধী অপরাধের নামে জামায়াতের দেশপ্রেমিক নেতৃবৃন্দের বিচারিক হত্যাকাণ্ড, শাপলা হত্যাকাণ্ডসহ ১৫টি বছর নিষ্ঠুরতা ও বর্বরতার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের গণতন্ত্র হত্যা করে।”
সভাপতির বক্তব্যে ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সভাপতি নূরুল ইসলাম আরও বলেন, “বর্তমানে বিশেষ ট্রাইব্যুনালে যে মামলাগুলো চলছে, যাদের রায় দেওয়া হয়েছে, এগুলো শুভঙ্করের ফাঁকি। যারা পালিয়ে আছে, শুধুমাত্র তাদের রায় দেওয়া হচ্ছে। যারা গ্রেপ্তার হয়ে আছে, তাদের রায় কেন দেওয়া হচ্ছে না? এই কারণ তাদের রায় দেওয়া হচ্ছে না, এই রায়ে দ্রুত কার্যকর করতে হবে; এতে তাদের ইন্টারনাল যে আতাত, সেই আতাতের গায়ে অনেক নুনের ছিঁটা পড়তে পারে।”
তিনি আরও বলেন, “জুলাইয়ের রক্তের ওপর দাঁড়িয়ে যারা রাষ্ট্র বিনির্মাণ, সংবিধান সংস্কার ও রাষ্ট্রের কাঠামো পরিবর্তনের কথা বলে ক্ষমতায় এসেছে, তারা পুরোনো ফ্যাসিবাদী কাঠামো পুনর্বহাল করে রাষ্ট্র পরিচালনার নীলনকশা করছে। প্রত্যেক জায়গায় তারা বলেছে—‘সবার আগে বাংলাদেশ’। অথচ এখন আমরা দেখতে পাচ্ছি, ‘সবার আগে বিএনপি’। তারা মানুষকে বোকা বানিয়েছে। বিদ্যুতের বিলে চার-পাঁচ হাজার টাকা অতিরিক্ত আসছে, আর এক-দেড় হাজার টাকার কার্ড দিয়ে মানুষকে শান্ত করার জন্য মিডিয়ায় তা উপস্থাপন করা হচ্ছে। তাদের এই কূটকৌশলের নিন্দা জানাই। আমরা একজন শাসক চেয়েছিলাম, পেয়েছি একজন রেফারি, যিনি কথায় কথায় মানুষকে কার্ড দেখাচ্ছেন।”
তিনি বলেন, “আমরা দেশের নিরাপদ আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি ও রাষ্ট্রের কাঠামোগত সংস্কার দেখতে চাই। জুলাই সনদের পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন দেখতে চাই। গণভোটে ৭০ শতাংশ মানুষের দেওয়া রায়কে উপেক্ষা করার যে দুঃসাহস আপনারা দেখিয়েছেন, তা থেকে অবিলম্বে সরে আসুন। অন্যথায় এই ৭০ শতাংশ মানুষ যখন নিজেদের অধিকার আদায়ে নামবে, তখন আপনাদের পালিয়ে যাওয়ার কোনো জায়গা থাকবে না।”
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে ছাত্রশিবিরের তৎকালীন কেন্দ্রীয় সভাপতি ড. শফিকুল ইসলাম মাসুদ (এমপি) বলেন, “২৮ অক্টোবর মানুষ হত্যার পৈশাচিকতার নজির দেখেছে বিশ্ববাসী। সেদিন মানুষ হত্যা করে লাশের ওপর নৃত্য করার পাশাপাশি পালস পরীক্ষা করে মৃত্যু নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্তও তারা নির্যাতন চালিয়েছে।”
বিএনপিকে উদ্দেশ্য করে তিনি বলেন, “বিগত ১৭ বছরে আওয়ামী লীগ জামায়াতে ইসলামীর নিবন্ধন বাতিল করেছে, প্রতীক নিষিদ্ধ করেছে, কার্যালয় বন্ধ রেখেছে এবং নেতৃবৃন্দের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে বাধা দিয়েছে। অথচ বিএনপির ক্ষেত্রে এমন পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। সেই আওয়ামী লীগের সঙ্গে জামায়াতে ইসলামীর আঁতাতের অভিযোগ তুলে নতুন করে অপপ্রচার চালিয়ে আমাদের নিশ্চিহ্ন করা যাবে না। আওয়ামী লীগ পারেনি, আপনারাও পারবেন না। আওয়ামী লীগ যে পথে হেঁটে শেষ পর্যন্ত দেশ ছাড়তে বাধ্য হয়েছে, আপনারা যদি একই পথে হাঁটেন, তাহলে আপনাদেরও একই পরিণতির মুখোমুখি হতে হবে। তাই সতর্ক হোন।”
সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি ও ঢাকা মহানগরী উত্তর জামায়াতের সেক্রেটারি ড. মুহাম্মদ রেজাউল করিম বলেন, “শহীদদের রক্ত কখনো বৃথা যায় না। তাঁদের রক্তের মধ্য দিয়ে এ দেশে ইসলামের পতাকা উচ্চকিত হবে। ইতোমধ্যে রাজধানীতে তার ঢেউ দেখতে পাচ্ছি। আগামী দিনে ছাত্রশিবির ও জামায়াতের ইসলামীর নেতৃত্বে এদেশে ন্যায়-ইনসাফের বাংলাদেশ কায়েম হবে, সেদিন আর বেশি দূরে নয়। ”
ঢাকসু ভিপি সাদিক কায়েম বলেন, “২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবর ভারতীয় আধিপত্যবাদী শক্তি ও আওয়ামী-বাম সন্ত্রাসীদের লগি-বৈঠার হামলা, মানুষ হত্যা এবং লাশের ওপর নৃত্যের মধ্য দিয়ে পৃথিবীর ইতিহাসে বর্বরোচিত ঘটনার নজির স্থাপন করে। এর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের গণতন্ত্রের সূর্য অস্তমিত হয়ে যায়। এরপর একে একে পিলখানা, শাপলা চত্বর ও ২০২৪ সালের গণহত্যাসহ বিচারবহির্ভূত হত্যা, গুম-খুন ও আয়নাঘরের মতো ঘটনার মধ্য দিয়ে ১৬ বছর বাংলার জমিনে হাসিনার ফ্যাসিবাদ জারি ছিল। হাসিনার ফ্যাসিবাদকে শক্তিশালী করার ক্ষেত্রে এ দেশের বামপন্থীরা সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করেছে।”
সভা উদ্বোধন ঘোষণা করেন ২৮ অক্টোবরের শহীদ হাফেজ গোলাম কিবরিয়া শিপনের গর্বিত পিতা তাজুল ইসলাম।
ঢাকা মহানগর উত্তর সভাপতি সাইফুল ইসলাম সাইম, মহানগর পূর্ব সভাপতি ইমদাদুল হক ও মহানগর দক্ষিণ সভাপতি হাফেজ দেলোয়ার হোসেনের যৌথ সঞ্চালনায় অনুষ্ঠিত আলোচনা সভায় বিশেষ অতিথি হিসেবে আরও উপস্থিত ছিলেন ঢাকা মহানগরী দক্ষিণ জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি ও ছাত্রশিবিরের সাবেক কেন্দ্রীয় কার্যকরী পরিষদ সদস্য মোহাম্মদ কামাল হোসেন এমপি, বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের সেক্রেটারি জেনারেল সিগবাতুল্লাহ এবং কেন্দ্রীয় দপ্তর সম্পাদক আজিজুর রহমান আজাদ।
এছাড়াও আরও উপস্থিত ছিলেন ২৮ অক্টোবরের শহীদ পরিবারের সদস্যসহ ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় ও মহানগরের নেতৃবৃন্দ।
ডেস্ক/আ.আ
মন্তব্য করুন: