[email protected] ঢাকা | বুধবার, ২৮শে অক্টোবর ২০২৬, ১৩ই কার্তিক ১৪৩৩
thecitybank.com

ফ্যাসিবাদী আ.লীগ কোনো রাজনৈতিক দল নয়, রাজনীতি করার কোনো অধিকার নেই তাদের: ডা. শফিকুর রহমান

চাঁপাই জার্নাল ডেস্ক:

প্রকাশিত:
২৭ অক্টোবার ২০২৬, ২৩:০২

বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমীর ডা. শফিকুর রহমান। ফাইল ছবি/সংগ্রহীত

ফ্যাসিবাদী আওয়ামী লীগকে কোনো রাজনৈতিক দল মনে করেন না বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ও বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান। তিনি বলেছেন, রাজনীতি সমাজে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা ও বৈষম্য দূর করার জন্য। এসব বৈশিষ্ট্য আওয়ামী লীগের মধ্যে নেই। তাই বাংলাদেশে আওয়ামী লীগের রাজনীতি করার কোনো অধিকার নেই।

মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) বিকেলে রাজধানীর আইডিইবি ভবনের মাল্টিপারপাস হলে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর উদ্যোগে ২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবর পল্টনে আওয়ামী লীগের লগি-বৈঠার হামলায় শহীদ পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে মতবিনিময় ও আলোচনা সভায় সভাপতির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

ডা. শফিকুর রহমান বলেন, আওয়ামী লীগ কোনো রাজনৈতিক দল নয়, এটি ফ্যাসিস্টদের একটি ক্লাব। তাঁর অভিযোগ, বিভিন্ন কায়দায় সন্ত্রাসের মাধ্যমে ক্ষমতায় গিয়ে দলটি হত্যা ও সন্ত্রাসের মাধ্যমে ক্ষমতা পাকাপোক্ত করতে চেয়েছে। ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি থেকে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট পর্যন্ত সন্ত্রাস, লুটপাট, তাণ্ডব, চাঁদাবাজি ও নারীর মর্যাদাহানির ঘটনা ঘটেছে বলেও তিনি দাবি করেন। এ সময় ১০ হাজার মুক্তিযোদ্ধাকে হত্যা এবং ৩৫ থেকে ৩৭ হাজার মানুষকে হত্যার অভিযোগ তুলে তিনি বলেন, এসব ঘটনায় কাউকে বিচারের মুখোমুখি করা হয়নি। নিজেদের অপকর্ম ঢাকতে বাকশাল ও নিজেদের রক্ষায় রক্ষী বাহিনী গঠন করা হয়েছিল বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

তিনি বলেন, শেখ হাসিনা জাতির কাছে নিঃশর্ত ক্ষমা চেয়ে ১৯৯৬ সালে ক্ষমতায় এলেও তাঁর মধ্যে রক্তের নেশা থেকে যায়। নিজের দলের একজন নিহত হলে ১০ জনকে হত্যার কথা শেখ হাসিনা বলেছিলেন উল্লেখ করে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, শাসক হয়ে জনগণকে হত্যার সরাসরি নির্দেশ দেওয়ার ধৃষ্টতা ফ্যাসিবাদী ঐতিহ্যেরই বহিঃপ্রকাশ।

২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবরের ঘটনা প্রসঙ্গে জামায়াত আমির বলেন, ২০০১ সালে জনগণের বিপুল সমর্থন নিয়ে চারদলীয় জোট ক্ষমতায় আসে। ২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবর আওয়ামী লীগ লগি-বৈঠা হাতে নিয়ে রাজধানীতে হাজির হওয়ার নির্দেশ দিয়েছিল বলে তিনি অভিযোগ করেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, মানুষকে পিটিয়ে হত্যার উদ্দেশ্যে লগি-বৈঠা নিয়ে আসা হয়েছিল এবং হত্যাকাণ্ডে বামপন্থী দলগুলোর নেতাকর্মীরা আওয়ামী লীগের সঙ্গে ছিলেন। তিনি অভিযোগ করেন, তাঁদের সহকর্মীদের হত্যা করে লাশের ওপর নৃত্য করা হয়েছিল এবং লাশ চুরি করারও চেষ্টা হয়েছিল।

তিনি বলেন, সেদিন চারদলীয় জোট সরকার ক্ষমতায় থাকা সত্ত্বেও মাগরিবের আগ পর্যন্ত এমন তাণ্ডব চলতে দেওয়া হলো কীভাবে, তা বড় প্রশ্ন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সামনে হত্যাকাণ্ড ঘটলেও তারা কেন বাধা দেয়নি, তা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি। তাঁর মতে, এ ঘটনায় কোনো বৃহৎ ষড়যন্ত্র ও নোংরা খেলা ছিল কি না, তা জাতির কাছে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। এসব হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় মামলা হলেও আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসে মামলার নথিপত্র ও আলামত গায়েব করে এবং মামলা প্রত্যাহার করে নেয় বলে অভিযোগ করেন তিনি।

আওয়ামী লীগকে উদ্দেশ করে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ৪০ বছর পর জামায়াত নেতাদের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা দিয়ে হত্যা করার ফল আওয়ামী লীগকে ভোগ করতে হবে। তাঁর ভাষায়, আওয়ামী লীগ এসব অপরাধের দায় থেকে পার পাবে না। তিনি বলেন, “আমরা এ বিচারের শেষ দেখে ছাড়ব।”

তিনি আরও বলেন, ২৮ অক্টোবরের ঘটনা বাংলাদেশের রাজনীতিকে ফ্যাসিবাদের দিকে নিয়ে গিয়েছিল, যা এখনো অব্যাহত রয়েছে বলে তিনি মনে করেন। আওয়ামী লীগ অতীতেও স্বাভাবিকভাবে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা থেকে বিদায় নিতে পারেনি উল্লেখ করে তিনি সতর্ক করেন, একই পথ অনুসরণ করলে অন্যদেরও একই পরিণতি হতে পারে। তিনি বলেন, তাঁরা খুনিদের ন্যায়বিচার চান, চাপিয়ে দেওয়া বিচার চান না এবং অন্যায়ভাবে কারও ফাঁসিও চান না।

জামায়াত আমির বলেন, কোনো ফ্যাসিবাদের হাতে বাংলাদেশকে ইজারা দেওয়া হবে না। বাংলাদেশকে পাহারা দিয়ে রাখার প্রত্যয় ব্যক্ত করে তিনি বলেন, জামায়াতের নেতৃবৃন্দ ও শহীদরা জীবন দিয়ে প্রমাণ করেছেন, তাঁরা আল্লাহ ও মানবতার জন্য সব সময় প্রস্তুত। অন্যায়ের কাছে তাঁরা মাথানত করবেন না। ফাঁসির কাষ্ঠে যাওয়ার সময় নেতাদের মনে ভয় ছিল না, কারণ তাঁরা নিজেদের ওপর জুলুম করা হয়েছে বলে বিশ্বাস করতেন এবং শহীদ হওয়ার মাধ্যমে আল্লাহর সঙ্গে সাক্ষাতের প্রত্যাশা করতেন।

তিনি আরও বলেন, আওয়ামী লীগের মধ্যে যাঁরা ভালো মানুষ, তাঁরা নিজেদের পছন্দের রাজনৈতিক ঠিকানা খুঁজে নেবেন। তবে বাংলাদেশে ফ্যাসিবাদ ফিরে আসবে—এমন স্বপ্ন কাউকে না দেখার আহ্বান জানান তিনি।

ডা. শফিকুর রহমান বলেন, বাংলাদেশে রাজনীতি করতে হলে মানবিক রাজনীতি করতে হবে। পাশবিকতা ও সন্ত্রাসের রাজনীতি করতে দেওয়া হবে না। সাড়ে ১৫ বছর এবং জুলাইয়ে যাঁরা নিহত হয়েছেন, তাঁদের শহীদ হিসেবে কবুল করার জন্য দোয়া করেন তিনি। শহীদদের রক্তের কাছে ঋণী থাকার কথা উল্লেখ করে তাঁদের আজীবন গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করার প্রত্যয় জানান জামায়াত আমির।

গণভোটের প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, মানুষ ফ্যাসিবাদের পরিবর্তন চায় এবং পরিবর্তনের পক্ষে গণভোটে রায় দিয়েছে। সংবিধান ঘষামাজার জন্য নয়, বরং রাজনীতির আমূল পরিবর্তনের জন্য জনগণ রায় দিয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি। তাঁর মতে, জনগণ এমন রাজনীতি চায়, যা দেশ ও মানুষের কল্যাণে কাজ করবে এবং কাউকে ফ্যাসিবাদী হওয়ার সুযোগ দেবে না। সরকার এ বিষয়টি ভুলে গেছে মন্তব্য করে তিনি সংবিধান সংস্কারে গণপরিষদ গঠনের আহ্বান জানান। একই সঙ্গে অন্যায়ের কাছে মাথানত না করার প্রত্যয় ব্যক্ত করে জনগণ, ন্যায়বিচার, মানবিক বাংলাদেশ গঠন এবং হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের বিচারের আওতায় আনার দাবি জানান তিনি।

অনুষ্ঠানে সঞ্চালনা করেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য ও ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের সেক্রেটারি ড. শফিকুল ইসলাম মাসুদ এমপি এবং ঢাকা মহানগরী উত্তরের সেক্রেটারি ড. রেজাউল করিম।

সভায় বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন জামায়াতের নায়েবে আমির এটিএম আজহারুল ইসলাম এমপি, সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক এমপি মিয়া গোলাম পরওয়ার, সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা রফিকুল ইসলাম খান এমপি, মাওলানা আবদুল হালিম ও অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের। এ ছাড়া বক্তব্য দেন কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য ও ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের আমির নূরুল ইসলাম বুলবুল এমপি এবং ঢাকা মহানগরী উত্তরের আমির মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিন।

অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন ২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবরের ঘটনায় শহীদ হাফেজ গোলাম কিবরিয়া শিপনের বাবা মো. তাজুল ইসলাম, শহীদ মুজাহিদুল ইসলামের মামা ও সংবাদকর্মী মিজান আহম্মেদ, শহীদ সাইফুল্লাহ মোহাম্মদ মাসুমের মা শামছুন্নাহার রুমি, শহীদ হাবিবুর রহমান মৃধার ছেলে রুবেল মৃধা, ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের সহকারী সেক্রেটারি কামাল হোসেন এমপি, হাফেজ রাশেদুল ইসলাম এমপি, জয়নুল আবেদীন এমপি এবং ডাকসুর সাবেক ভিপি আবু সাদিক কায়েম। দোয়া পরিচালনা করেন জামায়াতের নায়েবে আমির অধ্যাপক মুজিবুর রহমান এমপি।

এটিএম আজহারুল ইসলাম বলেন, ২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবর পল্টন মোড়ে ছয়জনকে প্রকাশ্যে লগি-বৈঠা দিয়ে পিটিয়ে হত্যা করা হয় এবং তাঁদের লাশের ওপর নৃত্য করা হয়। এ ঘটনাকে নৃশংস উল্লেখ করে তিনি আওয়ামী লীগকে সন্ত্রাসী দল বলে মন্তব্য করেন। তাঁর অভিযোগ, আওয়ামী লীগ সন্ত্রাসের মাধ্যমে ভয়ভীতি সৃষ্টি করে জনগণের রায় নিজেদের পক্ষে নেওয়ার চেষ্টা করেছে। তিনি বলেন, আওয়ামী লীগের ইতিহাস হত্যার ইতিহাস এবং দলটি ক্ষমতায় থাকলে জনগণ গণতন্ত্রের স্বাদ পাবে না।

মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, চারদলীয় জোট সরকারের ক্ষমতা হস্তান্তরের দিনে আওয়ামী লীগ পরিকল্পিতভাবে লগি-বৈঠা দিয়ে হত্যাকাণ্ড চালিয়ে দেশকে অগণতান্ত্রিক পথে নিয়ে যায়। এর ফলে বৈষম্যহীন, মানবিক, দুর্নীতিমুক্ত ও ইনসাফপূর্ণ বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি বলে মন্তব্য করেন তিনি।

তিনি আরও বলেন, আওয়ামী লীগের চরিত্র হলো গণতন্ত্রকে হত্যা করা। ক্ষমতার বাইরে থাকলে দলটি গণতন্ত্রের কথা বলে, আর ক্ষমতায় গেলে গণতন্ত্রকে হত্যা করে বলে অভিযোগ করেন তিনি। শেখ হাসিনার শাসনামলে লগি-বৈঠার ঘটনা, শাপলা চত্বরের ঘটনা, পিলখানা হত্যাকাণ্ড এবং মিথ্যা মামলায় জামায়াত নেতাদের ফাঁসি দেওয়ার প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, গণতন্ত্র হত্যার কারণেই শেখ হাসিনাকে অস্বাভাবিকভাবে ক্ষমতা ছাড়তে হয়েছে।

বিএনপিকে উদ্দেশ করে মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, ২০২৪ সালের জুলাইয়ের বিপ্লবের আকাঙ্ক্ষার অংশীদার হিসেবে বিএনপি যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, তা থেকে সরে এসে দলটি আবার ফ্যাসিবাদের পথে হাঁটতে শুরু করেছে। এ পথ থেকে সরে না এলে বিএনপিকেও একই পরিণতি বরণ করতে হতে পারে বলে সতর্ক করেন তিনি।

ডেস্ক/আ.আ


মন্তব্য করুন:

সম্পর্কিত খবর