প্রকাশিত:
৭ আগষ্ট ২০২৬, ২১:৪৭
‘ঝালকাঠির বিএনপি এবং অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীদের খাই খাই বন্ধ করার জন্য অনুরোধ করছি। ছয় মাসে অনেক খেয়েছেন, আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের পাহারার বিনিময় খেয়েছেন, আওয়ামীদের পক্ষে ওকলাতি করে খেয়েছেন, আওয়ামীদের বাড়িঘর পাহারা দিয়ে খেয়েছেন, ঠিকাদারি পাহারা দিয়ে খেয়েছেন। শেষ পর্যন্ত টাকার বিনিময় আওয়ামীদের দলে যোগদান করিয়েও খাচ্ছেন। মনে হচ্ছে আপনারা দলটাকেই খেয়ে ফেলবেন।’
বৃহস্পতিবার (৬ আগস্ট) দিবাগত মধ্যরাতে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে দেওয়া এক পোস্টে ঝালকাঠি-১ (রাজপুর-কাঠালিয়া) আসনের বিএনপি থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য রফিকুল ইসলাম জামাল এসব লিখেন। তিনি কেন্দ্রীয় বিএনপির ধর্ম বিষয়ক সম্পাদক।
পোস্টে তিনি লিখেন, লজ্জা থাকা উচিত যাদের রক্তের বিনিময়ে আপনাদের এত খাওয়ার সুযোগ হয়েছে, সেই ৩৬ জুলাই শহীদদের জন্য ৫ অগাস্ট একটু দোয়া মোনাজাত করতে পারেননি। পোস্টের শেষে তিনি ‘শুধু নেতা হতে পদের আকাঙ্ক্ষায় থাকলে দ্রুতই দল থেকে ঝরে পড়বেন’ বলে সতর্ক করেন।
সম্প্রতি ঝালকাঠির সদর উপজেলার কীর্তিপাশা ইউনিয়ন বিএনপির সাংগঠনিক সভাকে কেন্দ্র করে স্থানীয় রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়। সভায় ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি আবদুর রহিম মিয়ার উপস্থিতি এবং বিএনপির নেতাদের ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানানোর ঘটনাকে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়।
গত মঙ্গলবার ৪ আগস্ট বিকেল ৫টায় কীর্তিপাশা ইউনিয়ন পরিষদের সভাকক্ষে অনুষ্ঠিত এ সভার মূল উদ্দেশ্য ছিল দলের সাংগঠনিক কার্যক্রমকে আরও শক্তিশালী করা। সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ঝালকাঠি সদর উপজেলা বিএনপির সভাপতি এস এম এজাজ হাসান। সভাপতিত্ব করেন ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি মো. আনিসুজ্জামান চপল এবং সঞ্চালনা করেন সাধারণ সম্পাদক শরিফুল হক মিয়া।
এসময় বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মো. খোকন মল্লিক, প্রচার সম্পাদক আজিজুল হক এবং ইউনিয়ন বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক মো. কামরুল হাসান। সভায় ইউনিয়নের নয়টি ওয়ার্ডের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক নিজ নিজ এলাকার সাংগঠনিক কার্যক্রমের বিভিন্ন বিষয় তুলে ধরেন। তবে সভার আনুষ্ঠানিক কার্যক্রমের বাইরে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় আসে ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আবদুর রহিম মিয়ার উপস্থিতি। তিনি উপজেলা বিএনপির সভাপতি অধ্যাপক এস এম এজাজ হাসান, সাধারণ সম্পাদক মো. খোকন মল্লিকসহ অন্য নেতাদের ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানান। এরপরই বিষয়টি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়।
বিএনপি নেতাকর্মীদের দাবি, অতীতে তাকে আওয়ামী লীগের বিভিন্ন কর্মসূচিতে অংশ নিতে দেখা গেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সাবেক শিল্পমন্ত্রী আমির হোসেন আমুর সঙ্গে তার একাধিক ছবিও ছড়িয়ে পড়েছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে অনেকেই তার বর্তমান রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।
এ বিষয়ে আবদুর রহিম মিয়া বলেন, ‘আমার বাবা ও দাদাসহ পরিবারের সদস্যরা দীর্ঘদিন ধরে বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। আমি জনগণের ভোটে নির্বাচিত হয়েছি এবং সব সময় মানুষের কল্যাণে কাজ করার চেষ্টা করেছি।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমি শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের আদর্শে বিশ্বাস করি। ভবিষ্যতে বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকার আগ্রহ রয়েছে।’
এদিকে, বিষয়টি নিয়ে ব্যাখ্যা দিয়েছেন ঝালকাঠি সদর উপজেলা বিএনপির সভাপতি এস এম এজাজ হাসান। তিনি বলেন, ‘কেন্দ্রীয় নির্দেশনা অনুযায়ী বর্তমানে বিএনপিতে নতুন সদস্য অন্তর্ভুক্তি বা যোগদানের কোনো সুযোগ নেই। সাম্প্রতিক ঘটনাকে ঘিরে যে আলোচনা তৈরি হয়েছে, তা সঠিক নয়।’
তিনি আরও বলেন, ‘প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে ইউনিয়ন পরিষদের হলরুমে সভার আয়োজন করা হয়েছিল। ইউনিয়ন পরিষদের দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা সৌজন্যবশত নেতাদের ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন। এটিকে কোনো রাজনৈতিক যোগদান হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।’
এ ঘটনার পরপরই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেইসবুকে নিজের ভেরিফাইড পেইজে বিএনপির কেন্দ্রীয় ধর্ম বিষয়ক সম্পাদক ও সংসদ সদস্য রফিকুল ইসলাম জামাল এ ধরনের পোস্ট দিলেন। দলীয় নেতাকর্মীরা মনে করেন, এই ঘটনায় ক্ষুব্ধ হয়ে তিনি এ ধরনের পোস্ট দিয়েছেন। গত ৫ আগস্টের পরে আওয়ামী লীগের শীর্ষ পর্যায়ের একাধিক নেতার বিভিন্ন ঠিকাদারি কাজে দেখভাল করছেন বিএনপির পদধারী একাধিক যুবদল ও বিএনপি নেতারা। এছাড়াও ঝালকাঠির আদালতে বিভিন্ন রাজনৈতিক মামলার আসামি আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের পক্ষে মামলা পরিচালনা করছেন বিএনপিপন্থি একাধিক আইনজীবী।
এ বিষয়টি রফিকুল ইসলাম জামালকে ক্ষুদ্ধ করেছে। সম্প্রতি ঝালকাঠি জেলা পরিষদের প্রশাসক ও জেলা বিএনপির সদস্য সচিব শাহাদাৎ হোসেনের প্রেরিত ৪১৭টি প্রকল্প সাময়িক স্থগিত করেছে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়। অভিযোগ রয়েছে, ঝালকাঠির দুটি আসনে সংসদ সদস্যদের সাথে সমন্বয় না করে এ প্রকল্পগুলো অনুমোদনের জন্য পাঠানো হয়েছিল। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে ঝালকাঠি-১ আসনের সংসদ সদস্য রফিকুল ইসলাম জামাল ও ঝালকাঠি ২ আসনের সংসদ সদস্য ইসরাত সুলতানা এলেন ভুট্টো প্রকল্পগুলো বাতিলের জন্য স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় ডিও লেটার দেন। জেলা বিএনপির সদস্য সচিব শাহাদাৎ হোসেনের সাথে সংসদ সদস্য রফিকুল ইসলাম জামালের পূর্ব থেকে দ্বন্দ্ব রয়েছে।
এ বিষয়ে রফিকুল ইসলাম জামাল বলেন, নেতাকর্মীদের নৈতিক অবক্ষয় ও দলের প্রতি অনুগত্য অক্ষুণ্ন রাখতে অনেকটা মনে কষ্ট নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই মন্তব্য করেছি। আশা করি, নেতাকর্মীরা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের আদর্শকে ধারণ করে দলকে এগিয়ে নিয়ে যাবে।
ডেস্ক/আ.আ
মন্তব্য করুন: