[email protected] ঢাকা | শনিবার, ১২ই সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৮শে ভাদ্র ১৪৩৩
thecitybank.com

চাঁপাইনবাবগঞ্জে পানিবন্দি হাজারো মানুষ, পাঠদান ব্যাহত, বাড়ছে পানিবাহিত রোগ

নিজস্ব প্রতিনিধি:

প্রকাশিত:
১১ সেপ্টেম্বার ২০২৬, ২২:৫২

পানিবন্দি হাজারো মানুষ। ছবি: চাঁপাই জার্নাল

ভারতের উজান থেকে নেমে আসা ঢলের পানিতে চাঁপাইনবাবগঞ্জের সদর ও শিবগঞ্জ উপজেলার পাঁচটি ইউনিয়নের নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। এতে অন্তত প্রায় ২৯০০ পরিবার পানিবন্দি অবস্থায় রয়েছেন। এছাড়া শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পানি উঠে যাওয়ার কারণে প্রায় ২৯টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পাঠদান ব্যাহত হচ্ছে। এছাড়াও পানিবন্দি কবলিত এলাকায় পানিবাহিত ডায়রিয়া, চর্মরোগসহ অনান্য রোগের প্রকোপ দেখা দিয়েছে।

জানা যায়, পদ্মা নদীর পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হয়ে আমবাগানসহ বিস্তীর্ণ ফসলের মাঠ তলিয়ে গেছে। ফলে চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার নারায়নপুর ও আলাতুলি ইউনিয়নের ১৮০০ পরিবার এবং শিবগঞ্জ উপজেলার দুলর্ভপুর, উজিরপুর ও পাঁকা ইউনিয়নের ১১০০ পরিবার পানি বন্দি অবস্থায় রয়েছেন। এছাড়া সদর উপজেলার দুই ইউনিয়নে ১২ টি এবং শিবগঞ্জ উপজেলার তিনটি ইউনিয়নে ১৭টি প্রাথমিক মাধ্যমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পাঠদান ব্যাহত হচ্ছে।

কৃষি বিভাগের তথ্যমতে, উজানের ঢলে ও পদ্মা নদীর পানি বৃদ্ধির কারণে সদর ও শিবগঞ্জ উপজেলা পাঁচটি ইউনিয়নে মোট ১৩০.৪০ হেক্টর ফসলি জমি আক্রান্ত হয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখ্য যোগ্য রয়েছে, রোপা আমন, আউশ, গ্রীষ্ঠকালীন পেয়াজের বিজতলা, কলা, হলুদসহ অনান্য ফসল।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের সূত্রে জানা গেছে, শুক্রবার (১১ সেপ্টেম্বর) সন্ধায় পদ্মা নদীর পাঙ্খা গেজ স্টেশনে পানির উচ্চতা রেকর্ড করা হয়েছে ২১ দশমিক ৭৯ মিটার। নদীর বিপৎসীমা ২২ দশমিক ৫ মিটার। অর্থাৎ বিপৎসীমার মাত্র ২৬ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে পদ্মার পানি। এ ছাড়া পদ্মার পাশাপাশি মহানন্দা ও পুনর্ভবা নদীতেও পানি বাড়ছে। বর্তমানে মহানন্দা নদীর খালঘাট গেজ স্টেশনে পানির উচ্চতা রেকর্ড করা হয়েছে ১৯ দশমিক ৪৬ মিটার। এ নদীর বিপৎসীমা ২০ দশমিক ৫৫ মিটার। অন্যদিকে পুনর্ভবা নদীর রহনপুর গেজ স্টেশনে পানির উচ্চতা দাঁড়িয়েছে ১৯ দশমিক ৫২ মিটারে। এ নদীর বিপৎসীমা ২১ দশমিক ৫৫ মিটার।

স্থানীয় অধিবাসীরা জানান, পানির উৎসগুলো ডুবে যাওয়ায় প্লাবিত অঞ্চলে তীব্র খাবার পানির সংকট দেখা দিয়েছে। নিরাপদ পানি সংগ্রহ করতে দূরদূরান্তে যেতে হওয়ায় নারী, শিশু ও বয়স্কদের ভোগান্তি অনেক বেড়েছে। পাশাপাশি ফসলের ব্যাপক ক্ষতির আশঙ্কা করছেন স্থানীয় কৃষকেরা। এছাড়া পানিবাহিত রোগের পরিমানও বেড়ে গেছে।

আব্দুর রহিম বলেন, পদ্মা নদীর পানি বৃদ্ধির কারণে আমাদের এলাকা ডুবে গেছে। পানিবন্দি অবস্থায় রয়েছে অনেক মানুষ। গবাদি পশু নিয়ে বিপাকে পড়তে হয়েছে।

মুরশালিন নামের আরেকজন বলেন, পানিবন্দি অবস্থায় অনেক মানুষ দুবিষহ জীবন পার করছে। সবকিছু ডুবে গেছে। রান্নাবান্না করতেও সমস্যা হচ্ছে। অনেকে উচু করে মাচা নির্মাণ করে রান্নার কাজ করছেন। সরকারেরর প্রতি আহবান তারা যেন দ্রুত আমাদের পাশে দাড়ায়।

সাফিউল ইসলাম বলেন, বন্যায় ঘরবাড়িতে পানি উঠে যাওয়ায় পানিবন্দি হয়ে একদিকে মানুষ মানবেতর জীবনযাপন করছে। অন্যদিকে এলাকায় ডায়রিয়া, চর্মরোগসহ নানা পানিবাহিত রোগ বেড়ে গেছে। যারাই বন্যার পানিতে হাঁটাচলা করছেন, তাদের প্রত্যেকের শরীরে এখন চুলকানি দেখা দিচ্ছে।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপবিভাগীয় প্রকৌশলী মো. রকিবুল ইসলাম বলেন, বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী আগামীকাল (শনিবার) পর্যন্ত পদ্মার পানি বাড়তে পারে। এরপর পানি কমতে শুরু করার সম্ভাবনা রয়েছে। বর্তমানে পানি বিপৎসীমার নিচে থাকায় বড় ধরনের বন্যার আশঙ্কা নেই।

চাঁপাইনবাগঞ্জ সদর উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) মারুফ আফজাল রাজন বলেন, পানিবন্দি পরিবারগুলোর তালিকা তৈরি করা হচ্ছে এবং আজকে থেকে তাদের প্রত্যেকের কাছে ১০ কেজি করে চাল বিতরণ করা হচ্ছে।

শিবগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. মাজহারুল ইসলাম জানান, উপজেলার দুর্লভপুর, উজিরপুর ও পাঁকা ইউনিয়নের নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। ইতোমধ্যে ক্ষতিগ্রস্ত ৩০০ পরিবারের মাঝে ত্রাণসহায়তা প্রদান করা হয়েছে। পরবর্তী সময়ে পর্যায়ক্রমে সব পানিবন্দি মানুষের কাছে এই সহায়তা পৌঁছে দেওয়া হবে।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা প্রশাসক কার্যলয়ের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (শিক্ষা ও আইসিটি) শাহীন সুলতানা বলেন, সদর উপজেলায় ১২ টি ও শিবগঞ্জ উপজেলায় ১৭ টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পানি উঠে যাওয়ায় পাঠদান অত্র প্রতিষ্ঠানগুলোতে বন্ধ আছে। তবে অন্যত্র উচু স্থানে বিকল্প পাঠদান ব্যাবস্থা চালু রয়েছে।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মোঃ আতিকুল ইসলাম বলেন, উজানের পানির ঢলে ১৩০.৪০ হেক্টর জমির ফসল আক্রান্ত হয়েছে। যে রোপা আমন ধান গুলো ৮০ ভাগ পেকে গেছে সেগুলো কেটে নেওয়ার পরমর্শ দেওয়া হচ্ছে। এছাড়া দুই একদিনের মধ্যে আশা করছি পানি নেমে যাবে। ফলে তেমন কোন ক্ষতি হবে না। এছাড়া কৃষকদের সাথে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখা হচ্ছে।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা সিভিল ডাঃ এ, কে,এম, শাহাব উদ্দীন বলেন, বন্যাকবলিত এলাকায় যাতে ডায়রিয়া ও কলেরার প্রকোপ মহামারি আকারে ছড়িয়ে না পড়ে, সেজন্য পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট, খাবার স্যালাইন ও কলেরারা স্যালাইন সরবরাহ করা হচ্ছে। চর্মরোগের চিকিৎসার জন্য উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোতে পর্যাপ্ত পরিমাণ ওষুধ সরবরাহ করা হয়েছে। চর্মরোগে আক্রান্তদের উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে গিয়ে সেবা নেওয়ার আহ্বান জানানো হচ্ছে। এছাড়া সাপে কাঁটা রোগীর জন্য চিকিৎসার জন্য জেলা ও উপজেলা স্বাস্থ্য হাসপাতালে পর্যাপ্ত পরিমানে মজুদ রয়েছে।

এম.এ.এ/আ.আ


মন্তব্য করুন:

সম্পর্কিত খবর